সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের চামড়া খাত থেকে বছরে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। তিনি চামড়া শিল্পকে দেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান ও সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সারা বছর দেশে যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়, তা যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে পারলে বিপুল বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
শনিবার (১৬ মে) সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকায় চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে মন্ত্রী বিসিক কার্যালয়ে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে এক জরুরি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।
সাক্ষাৎকারে বিগত আমলের সমালোচনা করে শিল্পমন্ত্রী বলেন, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পকে সাভারে স্থানান্তর করার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত অপরিকল্পিত এবং অবহেলায় পূর্ণ। এই কাঠামোগত ভুলের কারণেই সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি দীর্ঘ দিনেও কাঙ্ক্ষিত বা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, বরং বিগত বছরগুলোতে চামড়া খাতটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অতিরিক্ত বর্জ্যের চাপ মোকাবিলার বিষয়ে মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপির বর্তমান যে সক্ষমতা রয়েছে তা ঈদ মৌসুমের জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
সিইটিপির বর্তমান প্রযুক্তিগত ও বর্জ্য ধারণের পরিসংখ্যান তুলে ধরে খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির জানান, বর্তমানে প্রি-ট্রিটমেন্টের মান সঠিকভাবে বজায় রেখে প্রতিদিন ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার সিপিএম তরল বর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে এই পরিশোধনাগারের। তবে ঈদের মৌসুমে দেশের ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় দৈনিক বর্জ্য পরিশোধনের চাহিদা প্রায় ৪৫ হাজার সিপিএমে পৌঁছে যায়। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের কারণে সিইটিপির ওপর অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয় এবং বর্জ্য শোধন কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত হওয়ার এক বড় আশঙ্কা থাকে।
পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ট্যানারি শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক হলেও সেই বাড়তি উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিবেশগত সংকট নিরসনে ভবিষ্যতে আর্থিক ও কারিগরিভাবে সক্ষম বড় বড় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব ইটিপি (অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপনে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হবে। এতে কেন্দ্রীয় ইটিপির ওপর থেকে একক চাপ অনেকটাই কমবে এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি কার্যকর হবে। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সরকার নীতিগত ও কারিগরি সহায়তা দেবে।
ট্যানারি শিল্পের পরিবেশগত সংকট সম্পূর্ণ দূর করতে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে শিল্পমন্ত্রী বলেন, সাভারের সিইটিপির সব ধরনের কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশসম্মত ট্যানারি শিল্প গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই মতবিনিময় সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন ট্যানারি মালিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।