Home জাতীয় আদালত থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় মাসুদ উদ্দিনের গায়ে ময়লা পানি-ডিম নিক্ষেপ

আদালত থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় মাসুদ উদ্দিনের গায়ে ময়লা পানি-ডিম নিক্ষেপ

Share

২০০৭-০৮ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অবসরপ্রাপ্ত এই লেফটেন্যান্ট জেনারেলকে সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে পল্টন থানার মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে ‘সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকায় পাঁচটি ও ফেনীতে ছয়টি মামলা রয়েছে।

রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গায়ে এক ব্যক্তি  ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপ করে। এ সময় তার গায়ে থাকা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের সামনে এবং পেছনে ময়লা দেখা যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা দ্রুত তাঁকে হাজতখানায় নিয়ে যান।

ওয়ান-ইলেভেনের ‘অন্যতম কুশীলব’ হিসেবে পরিচিত মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ফেনীর বিচারাধীন তিনটি হত্যা মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে তিনটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। ফেনীতে আরও তিনটি এবং ঢাকায় পাঁচটিসহ আটটি মামলা তদন্তাধীন।

ঢাকার পল্টন, বনানী, কোতোয়ালি, মিরপুর ও হাতিরঝিল থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানব পাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের (অর্থ পাচার) অভিযোগ রয়েছে। পল্টন থানার মামলায় তিনি তিন নম্বর আসামি। সেখানে মোট ১০১ জন আসামি রয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছে।

সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো অনেক আগের। এমন নয় যে, এগুলো পুলিশ বাদী হয়ে করেছে। এগুলোর বেশির ভাগের বাদী সাধারণ মানুষ। আমরা কোনো ব্যক্তি বা কারও অবস্থান দেখি না; বরং তার কৃতকর্ম বা অপরাধের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশ অর্থ ও মানব পাচারের মামলার কথা বললেও রাজনৈতিক কারণে কিংবা ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে ভূমিকার জন্য মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব মামলা আছে সেগুলোই তারা তদন্ত করছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা ও সবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাটাই তাদের লক্ষ্য।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আটক হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ ইস্যু সামনে এনে সামাজিক মাধ্যমে নানা মন্তব্য করছেন। তাদের অনেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময়ে আটক ও নির্যাতনের ঘটনায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেই দায়ী করছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মঙ্গলবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ ১/১১-তে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার শুরু করার জন্য।’

এদিকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মঙ্গলবার মানব পাচার আইনের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে চেয়ে আদালতে হাজির করা হয়। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ‘গ্রেপ্তারের পর মামলার ঘটনার বিষয়ে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি চালাক প্রকৃতির লোক হওয়ায় নিজেকে আড়াল করে মামলার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। এ অবস্থায় মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, পলাতক আসামি গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ ও চাঁদার টাকা উদ্ধার, মূল অপরাধী চক্র শনাক্তসহ অন্য আসামি গ্রেপ্তারে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। এ জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।’

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘তথাকথিত এক-এগারো সরকারের সময় এই আসামিসহ (জেনারেল মাসুদ) অন্যরা মিলে ট্রুথ কমিশন গঠন করে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্যাতন করতো। তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো। বিশেষ করে মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস। যাকে (তারেক জিয়া) টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।’

অন্যদিকে মাসুদ উদ্দিনের পক্ষে তার আইনজীবীরা রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন চান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে গত বছরের আগস্টে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে রাজধানীর বনানী থানায় ওই মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযুক্তদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন ছাড়াও তার স্ত্রী জেসমিন মাসুদ ও মেয়ে তাসনিয়া মাসুদকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, মাসুদ উদ্দিন তার জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল এবং অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতারণার মাধ্যমে ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত মোট ৯ হাজার ৩৭২ কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠান।

‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন মাসুদ উদ্দিন। ওই সময় সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মাসুদ তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি তখন গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান হন। মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি দিয়ে তাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল করা হয়। ওই কমিটির অধীনে তখন চালানো হয় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। সেই অভিযানের ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে নির্যাতনের ঘটনায় মাসুদ উদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

২০০৮ সালে মাসুদ উদ্দিনকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসেও তাকে সেই দায়িত্বে বহাল রাখে। তিন দফায় তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে তৎকালীন সরকার। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার পর তিনি ঢাকায় পাঁচতারকা হোটেল ও জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসায় যুক্ত হন। তিনি ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) যোগ দিয়ে ফেনী-৩ আসনে (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি ফেনী-৩ আসনে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের মার্চে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও আসামি করা হয়। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগও আনা হয়।
সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ‘শান্তির স্বপ্নে’ গ্রন্থে ওই সময় মাসুদ উদ্দিনের নানা ভূমিকার কথা উঠে আসে।

বইয়ে তিনি লিখেছেন, তারা তখন প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার জন্য শুরুতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে রাজি হননি। ড. ইউনূস অস্বীকৃতি জানানোর পর ড. ফখরুদ্দীনের নাম উঠে আসে। মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় যান এবং রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তখন গভীর রাত। আমি ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় ফোন করলাম। তিনি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমিও তাকে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে আমন্ত্রণ জানালাম।

এই বইতে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তখনকার সেনাপ্রধান লিখেছেন, ‘এ সময় দেশের গোয়েন্দা বিভাগ ও সাভার ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে সর্বাত্মক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। সাভার ডিভিশনের জিওসি দীর্ঘদিন ডিজিএফআইতে কর্মরত থাকার সুবাদে তার মতামত এ পরিষদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’

Related Articles

থানার ভেতরেই জুবায়ের-মোসাদ্দেককে পেটালেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা

রাজধানীর শাহবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) দুই নেতা এ...

এই প্রথম হরমুজ পার হওয়া জাহাজ থেকে টোল নিল ইরান

ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পীকার হামিদরেজা হাজিবাবেই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলা জাহাজের...

ফের বিয়ের পিঁড়িতে জেনিফার, পাত্র কে?

ভারতীয় ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জেনিফার উইংগেটকে ঘিরে নতুন করে বিয়ের গুঞ্জন...

শান্ত-ফিজে ভর করে কিউদের বিপক্ষে সিরিজ জিতল টাইগাররা

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ...