বল ছাড়া মেসি মাঠে হাঁটছেন। তার নিঃশব্দ হেঁটে বেড়ানোও যেন প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক—পাকা শিকারির লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিখুঁত আঘাত হানার চূড়ান্ত প্রস্তুতির মতো। চলতি বিশ্বকাপে এই তারকার নানা পরিসংখ্যান যেন সেই কথাই বলছে।
৩৯ বছর বয়সী তারকা বিশ্বকাপে মাঠে যত দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তার ৪৭ শতাংশই পার করেছেন পা টেনে টেনে হেঁটে। যা আসরের যে কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রতি ৯০ মিনিটে তার দৌড়ের পরিমাণ মাত্র ৮ দশমিক ২ কিলোমিটার। স্প্রিন্ট গড়ে ২ দশমিক ৭টি—চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে যা ছিল ৫ দশমিক ৩। সংখ্যাগুলো শুনলে মনে হতে পারে, এ বুঝি এক ফুরিয়ে আসা তারকার গল্প। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো—এটি তার শক্তি সংরক্ষণ করে চূড়ান্ত থাবা বসানোর প্রস্তুতির অংশ! কম দৌড়ে, কম শক্তি খরচ করে তিনি নিয়েছেন ৩৩ শট, তৈরি করেছেন ২১ গোলের সুযোগ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড় শট ও সুযোগ সৃষ্টি মিলিয়ে এত বেশি (৫৪) আক্রমণাত্মক অবদান রাখতে পারেননি। গতি নয়, এখন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফুটবলারের প্রধান অস্ত্র প্রজ্ঞা।
এই রূপান্তর নতুন নয়, বরং এক দীর্ঘ বিবর্তনের সর্বশেষ অধ্যায়। ২০০৫ সালে কিশোর বয়সে জুভেন্টাসের বিপক্ষে খেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন মেসি, যাকে দেখে রোনালদিনহো বলে উঠেছিলেন, ‘এই ছেলেই একদিন বিশ্বসেরা হবে।’ তারপর ২০০৯ সালের ২ মে, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পেপ গার্দিওলা তাকে ডান প্রান্ত থেকে সরিয়ে নিয়ে এলেন মাঠের মাঝখানে। জন্ম নিল আধুনিক ফুটবলের এক কিংবদন্তি অস্ত্র—‘ফলস নাইন’। ফলও মিলেছিল হাতেনাতে—বার্সেলোনার ৬-২ গোলের ঐতিহাসিক জয়। এরপরের তিন বছরে লা লিগায় ৬৯ ম্যাচে ৯৬ গোল—যেন গোলের এক অবিরাম স্রোত।
ট্রফির খরা আর জাতীয় দলের ভার তাকে বহুবার ভেঙে দিতে চেয়েছে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনাল—টানা তিন হৃদয়ভাঙা হারের পর একবার অবসরও নিয়েছিলেন। সেই ভঙ্গুর মেসির ভেতর থেকেই যেন জন্ম নিয়েছিল আরও দৃঢ় এক মেসি। ২০২১ সালে মারাকানায় ২৮ বছরের শিরোপাখরা ঘুচিয়ে, ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ সংক্রান্ত অপূর্ণতা ঘুচিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—গোলদাতা থেকে প্লেমেকার, প্লেমেকার থেকে অধিনায়ক—প্রতিটি রূপান্তরেই এই ফুটবলার ছিলেন অনন্য। পিএসজিতে প্রথম মৌসুমে গোলের চেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট (১১ গোল, ১৫ অ্যাসিস্ট) করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সময়ের দাবি মেনে নিজেকে বদলাতে খুদে জাদুকরের কোনো দ্বিধা নেই।
এই তারকার শৈশবের নায়ক পাবলো আইমার একদিন বলেছিলেন, ‘মেসির সবশেষ সংস্করণটাই সবসময় সেরা।’ সাবেক আর্জেন্টাইন তারকার কথাতেই পরিষ্কার—মেসি যখনই বদলেছেন, আরও পরিণত এক ফুটবলার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যখন মাঠে নামবেন, হয়তো নতুন কোনো সংস্করণ নিয়েই হাজির হবেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।