আমি চিনি আপনাকে। একবার মুখ দেখলেই হয়, আমি ভুলি না।’ বিশ্বকাপের সংবাদ সম্মেলনে দাগা এমন পাল্টা তোপে অখ্যাত বেচলারেরও তখন রীতিমতো বিখ্যাত হওয়ার মতো অবস্থা! বেচলার ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক, মানে পর্তুগিজভাষী। তিনি একটা পডকাস্ট করেন, যেটির নাম দিয়েছেন ‘বেচলার বনাম সিআর সেভেনের দশ ভক্ত’। সেখানে রোনালদোর ভক্তদের সঙ্গে তিনি তর্কে জড়ান, স্বাভাবিকভাবে পর্তুগিজ তারকার যত নেতিবাচক দিক আছে, সব তুলে ধরেন। এই সংবাদ সম্মেলনেই জানা গেল, রোনালদো এত দিন হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজে আসছিলেন তাঁকে!সংবাদ সম্মেলনে এসে তাঁর শোনা দ্বিতীয় প্রশ্নটিই ছিল এমন, এই বয়সে দলের প্রয়োজনে বদলি হিসেবে খেলার ব্যাপারটি তিনি কিভাবে দেখেন, আর শেষ বিশ্বকাপ নিয়েই বা ভাবনাটা কী? রোনালদোর জবাব, ‘সেই ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলে ঢোকার সময় থেকেই এই মানসিকতা আমি লালন করি যে দলের প্রয়োজনে নিজেকে উজাড় করে দেব। আর আগেও বলেছি, আমি কখন শেষ করব সেই সিদ্ধান্তটি আমিই নেব, অন্যরা নয়। একই প্রশ্ন বারবার করা সময়ের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। এই মুহূর্তে আমার সামনে আগামীকালের (গতকাল হয়ে যাওয়া) ম্যাচটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি আমি জিততে চাই।’ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপটাই শুধু জেতা হয়নি তাঁর, সেটি মনে করিয়ে দিতেই আবার আমিত্বে ঘা লাগল তাঁর, ‘আমার কোনো অপূর্ণতা নেই। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যা দিয়েছেন, অতটা আমি আশাও করিনি। আর বিশ্বকাপ জিতলেই ক্রিস্তিয়ানো বাড়তি কিছু হয়ে যাবে, আর না জিতলে আমার কিছু কমে যাবে, আমি তা ভাবি না। অবশ্যই আমরা সবাই এখানে জিততে এসেছি, কিন্তু সবাই তো জিতবে না, জিতবে কোনো একজন।’ যাঁরা তাঁকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসে, সেটিই তাঁর বড় পাওয়া বলে কিছুটা আবেগতাড়িতও হলেন, ‘হোটেলের লবিতে, লিফটে আমার সঙ্গে অনেকের দেখা হয়—কলম্বিয়ান, ভেনেজুয়েলান। তারা আমাকে তাদের গল্প বলে, চোখে জল নিয়ে আমাকে দেখে। এই বিশ্বকাপে মানুষের এই আবেগটা আমি সবচেয়ে বেশি অনুভব করছি। এটিই আমার সঙ্গে থেকে যাবে, আর সবকিছু স্রেফ আবর্জনা।’
বারবারই সমালোচকদের ধুয়ে দিয়ে বলছিলেন, ‘২৩ বছর ধরে তারা আমাকে মারতে চেয়েছে। কিন্তু আমি একই জায়গায় রয়ে গেছি। শুধুই তাদের সময় নষ্ট।’ মার্সেলো বেচলারের দিকে চড়াও হলেন এর মাঝেই। পরে অবশ্য নিজেকে সংবরণ করে এই ৪১ বছর বয়সের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বললেন, ‘এই জায়গাটায় আসতে অনেক কিছুই ছাড় দিতে হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে অনেক কিছু। আমি বুঝেছি, আমি সেই আগের মতো আর নেই। তবে একটা ব্যাপার বদলায়নি, সেটি হলো গোল করা। আমি গোল করে যাচ্ছি এবং আগামীকালের ম্যাচেও (গতকাল স্পেনের বিপক্ষে) গোল করতে চাই।’ শেষ দিকে আর্জেন্টাইন নারী সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে যখন লিওনেল মেসিকেও টেনে আনলেন, পর্তুগিজ তারকা এবার কিছুটা কৌতুকও করলেন, পাশাপাশি শেষ বিশ্বকাপের প্রসঙ্গটিও পরিষ্কার করে দেন সবার কাছে, ‘এবার বিমানে আর্জেন্টাইন এক বিমানবালার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমি বললাম, আমি জানি তুমি আর্জেন্টাইন। সে বলল, কিভাবে? আমি বললাম, যেভাবে তাকিয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়েছ তাতেই বুঝেছি যে তুমি আর্জেন্টাইন, আমাকে পছন্দ করো না। সমস্যা নেই, আমার স্ত্রীও আর্জেন্টাইন।’ এর পরই ওই নারী সাংবাদিকের প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের সূত্র ধরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে চাই এই আসরটা, যেটি হতে যাচ্ছে আমার শেষ বিশ্বকাপ। তবে আগামীকালের ম্যাচটাই যাতে শেষ ম্যাচ না হয়! তাহলে তো আপনারাই আবার ধুয়ে দেবেন আমাকে।’ এই বলেই মুখে চওড়া হাসি নিয়ে চেয়ার থেকে উঠলেন। কেমন যেন মুহূর্তে ডালাসের সংবাদ সম্মেলন কক্ষও আবেগতাড়িত হলো। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ আর বিশ্বকাপ উপলক্ষে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিকরাও হাততালিতে বিদায় জানালেন কিংবদন্তিকে।