Home খেলাধুলা জার্সি-বুট বিক্রি করা ছেলেটিই আজ প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ নায়ক

জার্সি-বুট বিক্রি করা ছেলেটিই আজ প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ নায়ক

Share

খেলা চলছিল বোস্টন স্টেডিয়ামে, কিন্তু রোমাঞ্চের যে চিত্রনাট্য সেখানে লেখা হচ্ছিল, তা বোধহয় কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানাবে। ম্যাচ শেষে প্যারাগুয়ের ২৬ বছর বয়সী গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল নিজেই বলছিলেন, ‘ম্যাচটা একটা হরর মুভির মতো ছিল। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না কী করেছি। জার্মানরা সবদিক থেকে ধেয়ে আসছিল।’

পরিসংখ্যানও যেন সেই কথারই সাক্ষী। পুরো ম্যাচে বলের দখল জার্মানির ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। তারা নিয়েছে ২১টি শট, আর প্যারাগুয়ে মাত্র ৭টি। কিন্তু সেই জার্মান ঝড়ের সামনে একাই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৬ ফুট ৬ ইঞ্চির এক গোলরক্ষক। টাইব্রেকারে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে প্যারাগুয়ের নতুন ‘বাজপাখি’ এখন অরল্যান্ডো গিল।

শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে জার্মানি ছিল স্পষ্ট ফেবারিট। আর গিলদের প্যারাগুয়ে? কাগজে-কলমে নিছক আন্ডারডগ। কিন্তু ফুটবল যে কখনো শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়, সেটাই আবারও প্রমাণ করলেন এই দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক। টাইব্রেকারে কিংবদন্তি ম্যানুয়েল নয়্যারকে হারিয়ে প্যারাগুয়েকে তুলে দিলেন শেষ ষোলোয়। সঙ্গে জার্মানির নামের পাশে যোগ হলো আরেকটি তিক্ত ইতিহাস, বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে পরাজয়

জার্মানির ২১টি আক্রমণ একাই নস্যাৎ করে দেওয়া গিলের জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটা কিন্তু ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাসে ছিল না। ২০০০ সালের ১১ জুন প্যারাগুয়ের সান লরেঞ্জোতে জন্ম নেওয়া অরল্যান্ডো ড্যানিয়েল গিল নলডিনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে। ছোটবেলায় ফরোয়ার্ড বা মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা শুরু করলেও একসময় থিতু হন গোলপোস্টের নিচে, যেখানে একদা রাজত্ব করতেন হোসে লুইস চিলাভার্ট ও জুস্তো ভিলারের মতো প্যারাগুয়ান কিংবদন্তিরা।

বিশ্বকাপের নায়ক হওয়ার মাত্র দুই বছর আগেও তীব্র আর্থিক অনটনে ভুগেছে গিলের পরিবার। বাধ্য হয়ে পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে নিজের জামাকাপড় পর্যন্ত বিক্রি করেছেন এই তরুণ। সেই কঠিন দিনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার করা একটি আবেগঘন পোস্ট তখন কারোরই নজরে আসেনি। যা আজ তার বিশ্বকাপ বীরত্বের পর নেট দুনিয়ায় ভাইরাল।

তবে গিলের জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা আসে তার সন্তানের জন্মের সময়। ফুটবলার পরিচয়ের চেয়েও তিনি যে একজন নিঃস্বার্থ ও ত্যাগী বাবা, তার প্রমাণ মেলে তখনই। নবজাতক ছেলের জরুরি চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিল একে একে বিক্রি করে দেন নিজের খেলার বুট, অনুশীলনের সরঞ্জাম, এমনকি অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের হয়ে পরা নিজের প্রিয় জার্সিটিও। বোস্টনের মাঠে আজ জার্মানির বিশ্বসেরা তারকাদের রুখে দেওয়া এই হাত দুটি আসলে সেই বাবার হাত, যিনি জীবনের চরম নির্মমতার মুখোমুখি হয়েও কখনো হার মানেননি।

অথচ এই বিশ্বকাপটা গিলের জন্য মোটেও স্বপ্নের মতো শুরু হয়নি। প্রথম ম্যাচেই স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল প্যারাগুয়ে। চার গোল হজমের পর সমালোচনার তীর ছুটে আসে তরুণ এই গোলরক্ষকের দিকে। দেশের কিংবদন্তি গোলরক্ষক হোসে লুইস চিলাভার্ট তরুণ গিলকে ধুয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সমালোচনার সেই আগুনকেই যেন নিজের জ্বালানি বানিয়ে নিলেন ২৬ বছর বয়সী এই গোলকিপার।

পরের দুই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের বিপক্ষে পাঁচটি করে সেভ করে দলকে এনে দেন দুটি ক্লিনশিট। আর জার্মানির বিপক্ষে নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে করলেন ৬টি চোখধাঁধানো সেভ। এরপর টাইব্রেকারে কাই হাভার্টজের প্রথম শটটি ডান হাত বাড়িয়ে রুখে দিয়ে যে মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাটা তিনি জার্মানদের দিয়েছিলেন, তাতেই পথ হারায় নাগেলসম্যানের দল। পরে নিক ভোল্টমেডের শটটিও আটকে দিয়ে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিজের বগলদাবা করেন গিল। আজ প্যারাগুয়ের মানুষ তাকে শুধু গোলরক্ষক নয়, নতুন জাতীয় নায়ক বলেই দেখছে।

তবে সেই সাফল্যের পেছনে ছিল নিখুঁত প্রস্তুতি। ম্যাচ শেষে গিল বলেছিলেন, ‘আমরা প্রতিটি খেলোয়াড়কে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করেছি। প্রত্যেকের অভ্যাস, শট নেওয়ার ধরন, ছোট ছোট সবকিছু নিয়ে কাজ করেছি। ঈশ্বরের রহমতে দুটি পেনাল্টি ঠেকাতে পেরেছি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন একটি দলকে হারিয়েছি। এই জয় পুরো প্যারাগুয়ের মানুষের জন্য।’

প্যারাগুয়ের ক্লাব ‘১৩ দে জুনিও’ ও ‘সিএস সান লরেঞ্জো’র যুব একাডেমিতে ফুটবলের হাতেখড়ি গিলের। সেখান থেকেই শুরু সিনিয়র ক্যারিয়ার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ধারে যোগ দেন আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান লরেঞ্জো দে আলমাগ্রোতে। শুরুতে রিজার্ভ বেঞ্চে থাকলেও, তার প্রতিভা চোখ এড়ায়নি ক্লাব কর্তৃপক্ষের। অল্প সময়েই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে জায়গা করে নেন মূল দলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত নতুন চুক্তিও পেয়ে যান।

জাতীয় দলের হয়ে তার অভিষেক হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে, পেরুর বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচে। তবে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তিনি নিয়মিত গোলরক্ষক ছিলেন না। কিন্তু ক্লাবের হয়ে কনমেবল সুডামেরিকানায় একের পর এক পেনাল্টি সেভ করে জাতীয় দলের কোচ গুস্তাভো আলফারোর নজর কাড়েন এবং সুযোগ পান বিশ্বমঞ্চে। সেই আস্থার প্রতিদান দারুণভাবেই দিচ্ছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে গিলের কণ্ঠে ঝরল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপার ম্যানুয়েল নয়্যারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। গিল বলেন, ‘নয়্যার একজন বিশ্বমানের গোলরক্ষক। তার মতো আইডলের মুখোমুখি হয়ে একই টাইব্রেকারে অংশ নেওয়া এবং ম্যাচ জেতাটা আমার কাছে এখনো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। আমি তাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি।’

জার্মানি বধের পর প্যারাগুয়ের এই রূপকথার দল এখন তৈরি হচ্ছে ফিলাডেলফিয়ায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পরবর্তী মহাযুদ্ধের জন্য। সামনে ফ্রান্স কিংবা সুইডেন, প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, গোলপোস্টের নিচে ৬ ফুট ৬ ইঞ্চির অরল্যান্ডো গিল নামের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল যে দাঁড়িয়ে আছে, তা এখন ভালো করেই জানে ফুটবল বিশ্ব।

ম্যাচ শেষে শান্ত কণ্ঠে তাই গিল বলেছিলেন, ‘এখন ঠান্ডা মাথায় বসে ভাবতে চাই আমরা কী অর্জন করেছি। ১২০ মিনিট পর্যন্ত লড়েছি। এরপর ভাগ্যও আমাদের পাশে ছিল। তবে আমাদের যাত্রা এখনো শেষ হয়নি।’

হয়তো সত্যিই শেষ হয়নি। কারণ বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরই জন্ম দেয় একজন নতুন নায়কের। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই গল্পের অন্যতম বড় চরিত্র হয়ে উঠেছেন অরল্যান্ডো গিল। আর বোস্টনের এই রাত মনে করিয়ে দেবে, সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিজের জার্সি-বুট বিক্রি করে দেওয়া এক নিঃস্বার্থ বাবার দুটি হাতই বদলে দিতে পারে পুরো একটি দেশের ফুটবল ইতিহাস।

Related Articles

হাজারো ডিসেম্বর যাবে, কিন্তু শেখ হাসিনা আর ফিরবেন না: রাশেদ খাঁন

হাজারো ডিসেম্বর চলে যাবে কিন্তু শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আর ফিরবে না বলে...

বিজয়া দশমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা

শারদীয় দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমী উপলক্ষে দেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সব নাগরিককে...

রণবীরকে ছাড়াই দুর্গাপূজায় আলিয়া, সঙ্গী ছিলেন কে

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতজুড়ে। পশ্চিমবঙ্গের...

বাংলাদেশের ফুটবলকে পরের ধাপে নিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে ফিফা

বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে ছেলেদের ও মেয়েদের ফুটবল, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং স্কুলভিত্তিক বিভিন্ন...