মুদিদোকান, প্রসাধনসামগ্রীর দোকান, রেস্তোরাঁ, ফার্নিচার ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতাসহ ১৭ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ এক লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের চার মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
তিনি জানান, নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানানো হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী অর্থবছরে মুদিদোকান, তৈরি পোশাক ও কাপড় বিক্রেতা, কনফেকশনারি, প্রসাধনসামগ্রীর দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার, সেনেটারি ও ফিটিংস, টাইলস, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্ট, ফার্নিচার, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও রেস্তোরাঁকে সুনির্দিষ্ট ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ লক্ষ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আগামী অর্থবছরে এ খাতে এক লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দিতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করতে এক হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ৫৫ লাখ পরিবারকে বছরে ছয় মাস ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হচ্ছে। এক হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা এবং ৪১৯ উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রম চালু করে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করা হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও ভৌত অবকাঠামো খাতে এক লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কোল্ড-চেইন ও লজিস্টিকস উন্নয়নের বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগও রয়েছে।
নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সরকার থ্রি-আর স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাবিজ’ চালু, ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে এফডিআই হিট ম্যাপ প্রকাশ, পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন ইপিজেড স্থাপন এবং কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়ায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে আড়াই লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে সরকার।
চার মোবাইল অপারেটরের কাছে পাওনা ১৩১৪৪ কোটি
দেশের চার মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চারটি মোবাইল অপারেটরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে গ্রামীণফোনের কাছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে সরকারের পাওনা ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, রবি আজিয়াটার কাছে ৬১৫ কোটি টাকা এবং বাংলালিংকের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট আপত্তি বাবদ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দাবি ছিল ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই দফায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে ভ্যাট সংক্রান্ত মামলার রায়ের পর আরো ৩৯২ কোটি ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করায় বর্তমানে বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
রাজস্ব বকেয়ার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা টেলিটকের কাছে লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিং, স্পেকট্রাম ফি, প্রশাসনিক জরিমানা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল বাবদ ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ইকুইটিতে রূপান্তরের আবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। রবি আজিয়াটার ক্ষেত্রে ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট আপত্তি সংক্রান্ত ৪৯০ কোটি টাকা এবং রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট বাবদ ১২৫ কোটি টাকা মিলিয়ে মোট ৬১৫ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। একইভাবে বাংলালিংকের কাছে ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট আপত্তি ও ভ্যাট বাবদ মোট ৪৭৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। বকেয়া রাজস্ব আদায়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্কের মানোন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথা জানান টেলিযোগাযোগমন্ত্রী।
ঢাকা-৪ আসনের সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কল ড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট ও দুর্বল নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। মোবাইল সেবার মান উন্নয়ন এবং গ্রাহকস্বার্থ সুরক্ষায় কোয়ালিটি অব সার্ভিস বেঞ্চমার্কিং সিস্টেম সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। এর আওতায় ২০২৬ সালে দেশব্যাপী প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার এলাকায় ড্রাইভ টেস্ট সম্পন্ন করা হয়েছে। ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ক কভারেজ ও সেবার মান যাচাই করা হচ্ছে। পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দুর্বল নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ সেবার মান আরো উন্নত হবে এবং গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।