Home খেলাধুলা ‘বিশ্বকাপ না জিতলে আমার কিছু কমবে না’

‘বিশ্বকাপ না জিতলে আমার কিছু কমবে না’

Share
হালকা রঙের টি-শার্ট আর শর্টস পরে ঢুকলেন সংবাদ সম্মেলনে। সামনে রাখা বরফশীতল পানির বোতলটা হাতে নিয়ে পানি খেলেন কয়েকবার।

ঘামে চকচকে মুখ। ডালাসে সেটিই স্বাভাবিক। তবে যখন কথা শুরু করলেন, মনে হলো আবেগের নদীতে বাঁধ বসিয়ে এসেছেন, কিন্তু সেই বালির বাঁধের মতো বারবার তা ধসে পড়ছিল। তাই অন্য যেকোনো তারকার সংবাদ সম্মেলনে যা হয় না, তেমন অনেক কিছুই হলো ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে।
এই লেখা ছাপা হতে হতে রোনালদোর এবারের বিশ্বকাপ ভাগ্য আপনি জেনে ফেলেছেন। ট্রফির স্বপ্নে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছেন, নাকি শেষবারের মতো বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছেন? স্পেনের বিপক্ষে সেই লড়াইয়ের আগে রবিবার সংবাদ সম্মেলন করতে এসে সিআর সেভেন এমন চেহারায় দেখা দিলেন যে পারলে অনেক সাংবাদিক পালিয়ে বাঁচেন! তাঁদেরই একজন মার্সেলো বেচলার। প্রশ্ন করেননি তিনি, তবু রোনালদো পড়লেন তাঁকে নিয়ে, ‘মাইকটা উনাকে দিন। হ্যাঁ, ওই যে সামনে বসে আছেন…, যিনি আমাকে পছন্দ করেন না।

দেখি, এবার ভালো কোনো প্রশ্ন উনি করেন কি না?’ বিব্রত সেই সাংবাদিক অবশ্য রোনালদোর অভিযোগ মানলেন না, ‘ক্রিস্তিয়ানো, সব ঠিক আছে। আমি ভালোবাসি আপনাকে। আপনাকে প্রশ্ন করা সব সময়ই আনন্দের। এই ৪১ বছর বয়সে কোন জিনিসটা সবচেয়ে কঠিন মনে হয় আপনার কাছে?’ রোনালদো ‘ফোরহ্যান্ড’ মারবেন বলে যেন তৈরিই ছিলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন জিনিস…(একটু থেমে), সেটি আপনার সঙ্গে কথা বলা; বিশেষ করে আপনার মতো যাঁরা আমাকে পছন্দ করেন না। আপনি সেই দলে।
আমি চিনি আপনাকে। একবার মুখ দেখলেই হয়, আমি ভুলি না।’ বিশ্বকাপের সংবাদ সম্মেলনে দাগা এমন পাল্টা তোপে অখ্যাত বেচলারেরও তখন রীতিমতো বিখ্যাত হওয়ার মতো অবস্থা! বেচলার ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক, মানে পর্তুগিজভাষী। তিনি একটা পডকাস্ট করেন, যেটির নাম দিয়েছেন ‘বেচলার বনাম সিআর সেভেনের দশ ভক্ত’। সেখানে রোনালদোর ভক্তদের সঙ্গে তিনি তর্কে জড়ান, স্বাভাবিকভাবে পর্তুগিজ তারকার যত নেতিবাচক দিক আছে, সব তুলে ধরেন। এই সংবাদ সম্মেলনেই জানা গেল, রোনালদো এত দিন হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজে আসছিলেন তাঁকে!সংবাদ সম্মেলনে এসে তাঁর শোনা দ্বিতীয় প্রশ্নটিই ছিল এমন, এই বয়সে দলের প্রয়োজনে বদলি হিসেবে খেলার ব্যাপারটি তিনি কিভাবে দেখেন, আর শেষ বিশ্বকাপ নিয়েই বা ভাবনাটা কী? রোনালদোর জবাব, ‘সেই ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলে ঢোকার সময় থেকেই এই মানসিকতা আমি লালন করি যে দলের প্রয়োজনে নিজেকে উজাড় করে দেব। আর আগেও বলেছি, আমি কখন শেষ করব সেই সিদ্ধান্তটি আমিই নেব, অন্যরা নয়। একই প্রশ্ন বারবার করা সময়ের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। এই মুহূর্তে আমার সামনে আগামীকালের (গতকাল হয়ে যাওয়া) ম্যাচটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি আমি জিততে চাই।’ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপটাই শুধু জেতা হয়নি তাঁর, সেটি মনে করিয়ে দিতেই আবার আমিত্বে ঘা লাগল তাঁর, ‘আমার কোনো অপূর্ণতা নেই। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যা দিয়েছেন, অতটা আমি আশাও করিনি। আর বিশ্বকাপ জিতলেই ক্রিস্তিয়ানো বাড়তি কিছু হয়ে যাবে, আর না জিতলে আমার কিছু কমে যাবে, আমি তা ভাবি না। অবশ্যই আমরা সবাই এখানে জিততে এসেছি, কিন্তু সবাই তো জিতবে না, জিতবে কোনো একজন।’ যাঁরা তাঁকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসে, সেটিই তাঁর বড় পাওয়া বলে কিছুটা আবেগতাড়িতও হলেন, ‘হোটেলের লবিতে, লিফটে আমার সঙ্গে অনেকের দেখা হয়—কলম্বিয়ান, ভেনেজুয়েলান। তারা আমাকে তাদের গল্প বলে, চোখে জল নিয়ে আমাকে দেখে। এই বিশ্বকাপে মানুষের এই আবেগটা আমি সবচেয়ে বেশি অনুভব করছি। এটিই আমার সঙ্গে থেকে যাবে, আর সবকিছু স্রেফ আবর্জনা।’

বারবারই সমালোচকদের ধুয়ে দিয়ে বলছিলেন, ‘২৩ বছর ধরে তারা আমাকে মারতে চেয়েছে। কিন্তু আমি একই জায়গায় রয়ে গেছি। শুধুই তাদের সময় নষ্ট।’ মার্সেলো বেচলারের দিকে চড়াও হলেন এর মাঝেই। পরে অবশ্য নিজেকে সংবরণ করে এই ৪১ বছর বয়সের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বললেন, ‘এই জায়গাটায় আসতে অনেক কিছুই ছাড় দিতে হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে অনেক কিছু। আমি বুঝেছি, আমি সেই আগের মতো আর নেই। তবে একটা ব্যাপার বদলায়নি, সেটি হলো গোল করা। আমি গোল করে যাচ্ছি এবং আগামীকালের ম্যাচেও (গতকাল স্পেনের বিপক্ষে) গোল করতে চাই।’ শেষ দিকে আর্জেন্টাইন নারী সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে যখন লিওনেল মেসিকেও টেনে আনলেন, পর্তুগিজ তারকা এবার কিছুটা কৌতুকও করলেন, পাশাপাশি শেষ বিশ্বকাপের প্রসঙ্গটিও পরিষ্কার করে দেন সবার কাছে, ‘এবার বিমানে আর্জেন্টাইন এক বিমানবালার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমি বললাম, আমি জানি তুমি আর্জেন্টাইন। সে বলল, কিভাবে? আমি বললাম, যেভাবে তাকিয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়েছ তাতেই বুঝেছি যে তুমি আর্জেন্টাইন, আমাকে পছন্দ করো না। সমস্যা নেই, আমার স্ত্রীও আর্জেন্টাইন।’ এর পরই ওই নারী সাংবাদিকের প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের সূত্র ধরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে চাই এই আসরটা, যেটি হতে যাচ্ছে আমার শেষ বিশ্বকাপ। তবে আগামীকালের ম্যাচটাই যাতে শেষ ম্যাচ না হয়! তাহলে তো আপনারাই আবার ধুয়ে দেবেন আমাকে।’ এই বলেই মুখে চওড়া হাসি নিয়ে চেয়ার থেকে উঠলেন। কেমন যেন মুহূর্তে ডালাসের সংবাদ সম্মেলন কক্ষও আবেগতাড়িত হলো। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ আর বিশ্বকাপ উপলক্ষে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিকরাও হাততালিতে বিদায় জানালেন কিংবদন্তিকে।

Related Articles

গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে...

কোন দলের সঙ্গে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে চান আর্জেন্টাইন কোচ

বিশ্বকাপের এবারের আসরে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তাদের...

বেতনের ১০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে দেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের...

ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে আঙ্কারায় ট্রাম্প, স্বাগত জানালেন এরদোয়ান

ন্যাটোর ২০২৬ সালের দুই দিনব্যাপী শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায়...