গত ৫৪ বছর ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা রিভার্স গিয়ারে চলা গাড়ির মতো পরিচালিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) খুলনা বিভাগীয় কমিশনার অডিটোরিয়ামে আসন্ন এইচএসসির পরীক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় কালে তিনি এসব কথা বলেন।
আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল; বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন বরিশাল অঞ্চলের কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যেমন গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে রিভার্স গিয়ারে চালাই। তেমন গত ৫৪ বছর এভাবেই চলেছি। এখন সামনে এগোনোর সময় এসেছে। জাতিকে আর পেছনের দিকে নেওয়া যাবে না। শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।’
কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও মেধা বিকাশের জন্য সরকার মিড ডে মিলের মতো বড় উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কোনো কর্মকর্তা বা শিক্ষকের গাফিলতির কারণে যদি কোমলমতি শিশুদের পচা খাবার দেয়া হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের শুধু চাকরিচ্যুত নয়, প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় ‘প্যারালাইজড’ (স্থবির) করে দেয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’
আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রে সনাতন পদ্ধতির নকল এখন আর নেই, তবে ‘ডিজিটাল নকল’ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে একটি চক্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের চেষ্টা করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘ফেসবুকে কেউ প্রশ্ন ফাঁসের ভুয়া তথ্য বা গুজব ছড়ালেই দ্রুত আইনের আওতায় নিতে আসতে হবে। অপরাধ প্রমাণ করতে পারলে সাইবার ক্রাইম আইনের আওতায় সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আমরা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রল বানাতে দিতে পারি না।’
মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের এক জায়গায় জেঁকে বসার সংস্কৃতির সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা ও দেশের বড় বড় শহরে যেসব শিক্ষা কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে অলস বসে আছেন, অথচ মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন না, তাদের তালিকা তৈরি করুন। যারা নিষ্ক্রিয়, তাদের অবিলম্বে উপজেলায় বদলি করা হবে। কর্মকর্তাদের অলসতা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।’
পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়া তল্লাশির নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল বা কোনো প্রকার অবৈধ কাগজপত্র নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। কোনো পরীক্ষার্থীর কাছে যদি পরীক্ষার হলে বই বা কাগজ পাওয়া যায়, তবে তার দায় ওই কক্ষের পরিদর্শককে নিতে হবে। শিক্ষকরা নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে বলতে পারেন না যে তারা দেখেননি।’
আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নকল হবে না। নকল শব্দটিই আমরা ২০০৬ সালে শেষ করে দিয়েছিলাম। তবে পরবর্তী সময়ে মূল্যায়ন পদ্ধতির কিছু দুর্বলতার কারণে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, এতদিন মূলত নম্বরের যোগফল যাচাই করা হতো। ভবিষ্যতে উত্তরপত্রের মূল্যায়ন নিয়েও আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু নকল প্রতিরোধ নয়, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোরের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফারুখে আজম মু. আব্দুস ছালামের সভাপতিত্বে সভায় বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হক, কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান, জেলা প্রশাসক মিজ হুমে জান্নাত, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।