এই তো দিন পাঁচেক আগের কথা। কানাডার অটোয়াতে মাইনাস ২ ডিগ্রির মধ্যে ফুটবল খেলে এসেছেন তিনি। সেই হিসেবে ঢাকার ২৪/২৫ ডিগ্রির তাপমাত্রা তাঁর কাছে গরমের মতোই, তবে শমিত সোমের কাছে সেই গরম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত ম্যাচের আগমন। মঙ্গলবার ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে চারপাশের উষ্ণতা টের পাচ্ছেন তিনি। ‘টিম মিটিংয়ে আমাদের কোচ বলছিলেন ২১ বছর ধরে আমরা নাকি ভারতকে হারাতে পারিনি। দেশে আসার পর থেকে দর্শক, স্টাফ– সবাই আমাকে বলেছে হারাতে হবে। আমি এখনও বাংলাদেশের জার্সি গায়ে কোনো ম্যাচ জিতিনি। ভারত ম্যাচই হবে সেই ম্যাচ, যেটিতে আমরা জিতব আশা করি।’
গতকাল জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুশীলনের আগে এভাবেই মিডিয়ার সামনে নিজের সুপ্ত ইচ্ছার কথা সবাইকে জানিয়ে দেন শমিত। কেউ একজন জানতে চেয়েছিলেন ভারত ম্যাচের আগে আপনাদের প্রেরণা কী? উত্তরে শমিত, ‘ভারত ম্যাচের জন্য আমাদের বাড়তি প্রেরণার দরকার নেই। সবাই জানে এই ম্যাচের গুরুত্বটা ঠিক কী। মনে আছে, আমি যখন বাংলাদেশের হয়ে খেলব বলে সাইন করি, তখন আমাকে বলা হয়েছিল ভারতের সঙ্গে এই ম্যাচের জন্য প্রস্তুত থাকতে। ম্যাচটি আমাদের জিততে হবে এবং আমরা সেটা জিতব।’ চোয়াল শক্ত করা উত্তর ছিল মিডফিল্ডার শমিত সোমের। তবে শমিতের অনুরোধ একটাই– দলে দেশি-প্রবাসী বলে কাউকে আলাদা যেন না করা হয়। ‘এখানে দেশি-বিদেশি বলতে কিছু নেই। আমরা সবাই একটি দল, একটি বাংলাদেশ। আমরা একসঙ্গে থেকেই সব কিছু করি। আমরা বিদেশি ভার্সাস দেশি– চিন্তা করি না। ওভাবে চিন্তা করলে আমরা ম্যাচ জিততে পারব না। আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে শিখতে হবে।’
সন্ধ্যায় জাতীয় স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে তিনি যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন তার কাছাকাছি সময়ে ভারতীয় ফুটবল দল ঢাকায় পা রেখেছে। তারাও অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত ভারতীয় ফুটবলার রায়ান উইলিয়ামসকে নিয়ে এসেছে। তবে একটি শঙ্কা নিয়েই এসেছেন রায়ান। কোনো অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল সংস্থার কাছ থেকে এখনও ছাড়পত্র পাননি এই উইঙ্গার। তবে ভারতীয় দলের শক্তি-দুর্বলতা জানা আছে শমিতের। কৌশলগত কারণেই অনেকটা বলেননি তিনি, তবে যেটুকু বলেছেন, তাতে স্পষ্ট মাঝমাঠ আর ডিফেন্সের মাঝে ভারতীয় দলের একটা দুর্বলতা এই মুহূর্তে বের করে নিয়েছেন হামজা-শমিতরা। ‘ওদের দলে কিছু গ্যাপ আছে। নেপালের মতো ডিফেন্স নেই ওদের। আমাদের সেই সুযোগটাই নিতে হবে। লম্বা শট খেলতে হবে। হয়তো একটু দূর থেকে শট খেলতে পারব আমরা।’
এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে গত মার্চে ভারতের মাঠ শিলংয়ে খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ দল। ২৫ মার্চ সেই ম্যাচেই বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক হয় লেস্টার সিটিতে খেলা হামজা চৌধুরীর। কিন্তু গোলশূন্য সেই ম্যাচে মন ভরেনি হামজার। এবার ঢাকায় ভারতের সঙ্গে ফিরতি ম্যাচে সেই অপূর্ণতা পূরণ করতে চান তিনি। ‘ভারতের সঙ্গে এই ম্যাচের গুরুত্ব আমি জানি। আশা করি, ম্যাচটিতে নিজের সেরাটা দিতে পারব। আমরা জিততে পারব।’ কিছুদিন আগে একটি বিজ্ঞাপনী চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এভাবেই মনের কথাটি বলেছিলেন হামজা। গত ৯ মাসে বাংলাদেশের হয়ে পাঁচটি ম্যাচ খেলেই তিনি বুঝে নিয়েছেন দলের কন্ডিশন। লেস্টারের যিনি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, খেলে থাকেন সাধারণত রাইট ব্যাকে, তিনিই বাংলাদেশ দলের হয়ে রক্ষণ থেকে আক্রমণ– সব জায়গায় দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। মাত্র পাঁচ ম্যাচেই চারটি আন্তর্জাতিক গোল করেছেন। যার মধ্যে নেপালের বিপক্ষে বাইসাইকেল কিক আর পানিনকার মতো শট দেখিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছেন। শমিতের কথাতেও উঠে এসেছে শেষে এসে তরী না ডোবার জন্য কী কী করতে যাচ্ছেন তারা ভারতের বিপক্ষে।
‘আমাদের মাঠের পারফরম্যান্স ভালো হচ্ছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে গোল খেয়ে যাচ্ছি। কখনও কখনও ভাগ্য আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে না। সেদিন নেপালের গোলটি হয়তো অফসাইড ছিল, সে যাই হোক। আমাদের ফোকাস থাকতে হবে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্ত পর্যন্ত। জিরো থেকে নব্বই মিনিট নয়, অতিরিক্ত সময়েও আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। এসব নিয়ে দলের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে, আশা করছি, ভারত ম্যাচে সেই ভুলগুলো আর হবে না।’ দেশি ফুটবলারদের ভুলে বারবার ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, কোচ ক্যাবরেরার কৌশলেও ভুল আছে– এমন একটি অভিযোগ আছে সমর্থকদের মধ্যে। যদিও শমিত ব্যাপারটি এভাবে দেখতে রাজি নন। ‘আমরা কিন্তু হংকং আর নেপাল দুটো ম্যাচেই লিডিংয়ে থেকে ড্র করেছি। আমাদের কিছু কিছু ব্যাপার শিখতে হবে, মাইন্ড গেম খেলতে হবে। এই যেমন কীভাবে কিছুটা সময় ক্ষেপণ করা যায়, এসব কিছু ছোট ব্যাপার আমাদের শিখতে হবে।’ এবং শিক্ষাগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়েই হামজা-শমিতরা পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবেন– এমন আশা টিম ম্যানেজমেন্টের।
সুত্রঃ সমকাল