জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা এবং তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা নিয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা নৈতিকতার প্রশ্নে গাজী নজরুল ইসলামকে কোনো সংসদীয় কমিটিতে না রাখার আহ্বান জানালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা ভোটদানে বিরত থাকার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার কথা জানান তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে এ বিতর্ক হয়।
স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কোটা থেকে যেহেতু উনাকে দেওয়া হয়নি সেক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নাই।’
তবে নৈতিকতার দিক থেকে যেহেতু তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে, তাই দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের কোনো কমিটিতে তাকে না রাখাই উত্তম বলে জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
এর জবাবে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘এখানে কনফিউশনের কোনো সুযোগ নেই। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদের কোনো না কোনো কমিটিতে রাখতে হয়। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোতে যেহেতু বিরোধীদলের পক্ষ থেকে যে নামগুলো দেওয়া হয়েছে ওখানে তার (গাজী নজরুল) নাম ছিল না সেখানে রাখা হয়নি। সংসদীয় যে কমিটিগুলো আছে সেখানে দুইটাতে তাদের আপত্তি ছিল রাখা হয়নি। এখন কোনো না কোনো কমিটিতে রাখতে যেয়ে গাজী নজরুল ইসলাম সাহেবকে রাখতে হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই বলেছেন—গাজী নজরুল ইসলাম তাদের পক্ষ থেকে মনোনীত হয়ে ওই কমিটিতে যাননি। ফলে এ বিষয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।
এরপর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াতে ইসলামী তার সদস্য পদ শূন্য করার জন্য নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারকে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু শুধু দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংবিধান অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয় না।
মন্ত্রী বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ সেখানে আসে না, যদি নিজে পদত্যাগ না করেন। এখন বিষয় হচ্ছে, বুদ্ধি বাড়িয়ে দিব কি জানি?’
বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যি সত্যিই চান তার আসনটা শূন্য হোক, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের পক্ষে ভোট দেয় নাই এবং ভোটদানে বিরত ছিল; সেই জায়গায় ৭০ অনুচ্ছেদ কিন্তু আসে। এখন সেইটা কগনিজেন্সে (আমলে) নিয়ে যদি আপনারা মাননীয় স্পিকারকে মনোযোগ আকর্ষণ করেন, চিঠি দেন বা নির্বাচন কমিশন দেন, আমরা সেই হিসেবে বিধি মোতাবেক সাংবিধানিকভাবে সহযোগিতা করতে পারি। এই বুদ্ধিটা বিনা পয়সা দিলাম।’
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান রসিকতার সুরে বলেন, ‘গ্রামে একটা কথা চালু আছে আর কি যে, কোনো দুর্বল মানুষের উপরে প্রতিশোধ নিতে হলে তারে মেম্বার ইলেকশনে দাঁড় করায়ে দেওয়া। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝে মাঝে এরকম আমাদেরকে কিছু টিপস দেন, আমরা এনজয় করি। এইজন্য সেদিন বলছিলাম যে, উনি থাকলে সংসদ প্রাণবন্ত হয়—আইদার পজিটিভ অর নেগেটিভ, কিছু একটা হয়। আমরা এখন তাকে ফ্লোর ক্রসিংয়ের কথা বলবো কেন? আমরা তো তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। আমরা তো এখন এটা বলতে পারি না যে, তিনি আমাদের দলের সদস্য হয়ে ফ্লোর ক্রসিং করেছেন। আমাদের সিদ্ধান্ত ভায়োলেট করেছেন। এটুকু বলার কোন সুযোগ নাই।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘তবে আমরা আগেই অনাপত্তি বলেছিলাম, যেহেতু আমাদেরকে কোটায় আসে নাই। কিন্তু মহান জাতীয় সংসদের মতো প্রেস্টিজিয়াস হাউজে, যাকে আমরা নৈতিক কারণে বহিষ্কার করে চিঠিও দিয়েছি—কোনো কমিটিতে না রাখাটা উত্তম ছিল, সেটা নৈতিকতার দিক থেকে বললাম। এখন এটা রিথিংক করার সুযোগ আছে। কারণ, বিভিন্ন সময় পুনর্মূল্যায়ন হয় অদল-বদল হয় ড্রপ হয় আবার অ্যাড হয়। আমি মনে করি নৈতিকতার তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা একটা এক্সাম্পল হবে যদি উনাকে কোথাও রাখা না হয়।’
বিরোধীদলীয় নেতার এমন বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এর দ্বারা আমাদেরকে হয়তো বুঝে নিতে হবে, গাজী নজরুল ইসলামের সদস্যপদটা বহাল থাকলো; কিন্তু কমিটিতে রাখা যাবে না। আমি এর বেশি কিছু বুঝি নাই। কারণ, বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধে ইচ্ছা করলে এই কমিটি থেকে তাকে বাদ দেওয়া যায়। এখন পুনর্গঠন আবার করা যাবে, এখনো এপ্রুভ হয় নাই। বাদ দেওয়া গেলে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন হবে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি কারো বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলতে চাচ্ছি না। বাদ দেওয়া হলো। কিন্তু আমরা বুঝে গেলাম তার সদস্য পদ শূন্য করার পক্ষে তিনি নন। মানে এটাই বুঝে গেলাম। কারণ দল থেকে বহিষ্কার করলে সংবিধান অনুযায়ী সদস্য পদ যায় না। সংসদ সদস্য যদি দলের বিপক্ষে ভোট দেন, ভোটদানে বিরত থাকেন—৭০ বিধি অনুসারে তার আসন শূন্য হবে অথবা তিনি যদি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেন। যেহেতু মার্কা নিয়ে নির্বাচন করেছেন, তিনি অস্বীকার করতে পারবেন না যে তার দলীয় সদস্য পদ বহিষ্কার করার পরে তার সদস্য যায় না; এটা অস্বীকার করা যাবে না আইনের ভাষা হিসেবে। সুতরাং বৈধ এটাই যে, তার সদস্যপদটা বহাল থাকলো। যদি বিরোধী দল ওই রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের সময় তার অনুপস্থিতি কাউন্ট করে ৭০ আর্টিকেল অনুসারে চিঠি না দেন; তাহলে তার সদস্যপদটা বহাল থাকে। এটা আমরা তাইলে বুঝে নিলাম। মানে সদস্যপদ বহাল থাকলো কিন্তু কমিটিতে রাখা যাবে না।’
তবে গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে রাখার বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধকে গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যদি বিরোধীদলীয় নেতা চান যে তার দলের মার্কা নিয়ে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোটদানে বিরত ছিল; সেই প্রেক্ষিতে তিনি ৭০ অনুচ্ছেদে তার সংসদের আসন শূন্য করার জন্য চিঠি দিতে পারেন। আর যদি তিনি না চান অন্য কোনো বিধি নাই তার সদস্য পদ শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে। এখন যদি সংসদের এই কমিটি থেকে নাম বাদ দিতে হয় আমরা বিরোধীদলীয় নেতার সম্মানার্থে আমরা বাদ দিয়ে দেব। আর তার সম্পর্কে চর্চা করবো না।’
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার নৈতিকতার প্রশ্নে করা আবেদনকে সমর্থন করেছেন এবং এজন্য তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ বলছে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে, ভোটদানে বিরত থাকলে কথা নাই আমার জানামতে। এটা প্রযোজ্য হবে না এ ব্যাখ্যা।’
উল্লেখ্য, গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গত ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। তবে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও সংবিধান অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তাকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা এবং তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা তৈরি হয়।