স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রম হলেও পূর্ণ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমিও ক্ষুদ্র একটি শহীদ পরিবারের সন্তান। আমাদের পরিবার কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে তাদের সঙ্গে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।‘
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর আনা জনগুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
অধিবেশনে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমকে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের গর্বিত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমিও ক্ষুদ্র একটি শহীদ পরিবারের সন্তান। সেই মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছিলেন, আমাদের পরিবার কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে তাদের সঙ্গে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ আমাদের সকলের।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে কেউ না কেউ এ দেশের শাসনভার পরিচালনা করবেন, এটিই স্বাভাবিক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন রাজতন্ত্র থাকে না, সেখানে বংশপরম্পরায় শাসনের অবস্থাও থাকে না। সেখানে জনগণের ভোটে গঠিত সরকার দেশ পরিচালনা করে। দুঃখের বিষয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও জনগণের ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা করা হয়েছে।’
সংবিধান নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম যে সরকার হয়েছিল, তারা জনগণের ভোট পেয়েই নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমরা সেখানে লক্ষ করলাম, যারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের কারণে এই সুযোগটা পেয়েছিলেন, তারাই এসে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করলেন। বাহাত্তরের যে সংবিধান, তার অনেকটুকু এখানে হারিয়ে ফেলে। যখন একদলীয় কোনো শাসনব্যবস্থা কোনো দেশে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়ে যায়, কার্যত সেই দেশে জনগণের ভোটের আর কোনো মূল্যায়ন থাকে না। এভাবে বারবার সরকার এসেছে, সরকার গিয়েছে।’
বিগত সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিলেন ২০০৮ সালের একটা বোঝাপড়া নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, তারা দেশে কী করেছেন তার জ্বলন্ত সাক্ষী আজকের এই সংসদ। আমি সেই জন্য বলেছিলাম, আমার ধারণা, ফ্যাসিস্ট সরকারের হাতে নির্যাতনের শিকার হননি, বোধ হয় এমন কোনো সদস্য এখানে নেই। কেউ হয়েছেন বারবার, কেউ হয়েছেন হয়তো একবার। যারা সৌভাগ্যবান, অনেকেই দেশেই থাকতে পারেন। নির্যাতনের ভয়াবহতা এতটাই ভারী ছিল যে তারা নিজ জন্মস্থানের মাটি আঁকড়ে ধরে থাকতে পারেননি।’
দীর্ঘ সময় ধরে জাতির ওপর প্রচণ্ড শাসন চাপিয়ে দিয়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছে মন্তব্য করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে। বোনেরা বিধবা হয়েছেন, শিশুরা এতিম হয়েছে। অসংখ্য লোককে গুম করা হয়েছে। গুমের শিকার ২৩৫ জন লোক এখনো তাদের আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি। তাদের আপনজন জানেন না আসলে তাদের বাস্তব অবস্থা কী হয়েছে! তারা কি বেঁচে আছেন নাকি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সময়ের ভেতরে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের (বিচারবহির্ভূত হত্যা) শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা মিনিমাম কোনো বিচারের আলো দেখার সুযোগ পাননি। তাদেরকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। কার্যত তখন যারা আমরা বিরোধী দলে ছিলাম, এর নির্মম ভিকটিম তারাই হয়েছিলেন। এ সমস্ত পরিবারের কাছে আজ আমাদের কোনো জবাব নেই। শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে একে একে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল এবং সবগুলোতে দলীয় কর্তৃত্ব এককভাবে কায়েম করা হয়েছিল দেশকে কুক্ষিগত করার জন্য।’
ওই ফ্যাসিবাদ যাতে আর ফিরে না আসে, সেই আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশ একটা ন্যায্যতার ভিত্তিতে, ন্যায়বিচারের ওপরে কায়েম হবে; যেখানে সবাই নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার পাবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল এবং সমন্বয়কদের দীর্ঘ আলোচনার পর ইনটেরিম গভমেন্ট (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে দিয়েছিল, তারা সংস্কারের কিছু প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছেন। এরই আলোকে প্রেসিডেন্ট একটি আদেশ জারি করেছেন।’
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমরা লড়ে গেছি সবাই। তাদের অপকর্মের শেষ পরিণতি হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে আন্দোলন তরুণ-যুব সমাজের দ্বারা দানা বেঁধে উঠেছিল, আগস্টের ৫ তারিখে তা পরিণতি লাভ করেছে। এ জন্য কোনো দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই বলে কিছু নেই, আমাদের দেশে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলন শুধু মুষ্টিমেয় কিছু যুব সমাজ সম্পৃক্ত ছিলেন না; বরঞ্চ এই আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা, মুটে-মজুর, ছাত্র-জনতা সবাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। দুধের শিশু নিয়ে মা-ও রাস্তায় নেমে এসেছিলেন এবং চার বছরের শিশুও এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে।’
তথ্যসুত্রঃ এশিয়া পোস্ট